শনিবার ১৩ জুন ২০২৬
Online Edition

অবৈধ ইটভাটার দৌরাত্ম্য

দূষণরোধ, প্রাকৃতিক পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় ইটভাটা স্থাপনে নানাবিধ বিধিনিষেধ আরোপ করা হলেও তা মানা হচ্ছে না বরং সারাদেশেই আইন ও বিধি লঙ্ঘন করে যত্রতত্র ইটভাটা স্থাপন করা হচ্ছে। চালানো হচ্ছে রমরমা ব্যবসায়িক কার্যক্রম। ইট পোড়াতে জ¦à¦¾à¦²à¦¾à¦¨à¦¿ কাঠের ব্যবহার নিষিদ্ধ হলেও কোন কোন ক্ষেত্রে তা মানা হচ্ছে না। এক্ষেত্রে এগিয়ে রয়েছে দেশের উত্তরাঞ্চল। ফলে পরিবেশ দূষণ ও জীববৈচিত্র্যের ওপর বড়ধরনের নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। যা এখন রীতিমত উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে।

প্রাপ্ত তথ্যে জানা গেছে, রংপুরসহ উত্তরাঞ্চলের ১৬ জেলায় প্রায় ১ হাজার ৯০০ ইটভাটা রয়েছে, যার বেশিরভাগই অবৈধ। এসব ইটভাটা থেকে নির্গত কালো ধোঁয়া পরিবেশের মারাত্মক ক্ষতি করছে। সেই সাথে ধোঁয়ায় থাকা ক্ষতিকর কার্বন ডাই-অক্সাইড মানব শরীরে ভয়ংকর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। শ্বাসকষ্টসহ নানা রোগে ভুগছেন সংশ্লিষ্ট এলাকার সাধারণ মানুষ। সংশ্লিষ্টদের দেয়া তথ্যমতে, কয়লাচালিত এসব ইটভাটা উত্তরাঞ্চলের ২০ হাজার একরের বেশি জমি গিলে খেয়েছে। অবৈধ এসব ইটভাটায় পরিবেশের ক্ষতি হলেও স্থানীয় প্রশাসন দেখেও না দেখার ভান করছে। এদিকে পরিবেশ অধিদপ্তরের দাবি, অবৈধ ইটভাটা বন্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে তারা। তবে বাস্তবতা হচ্ছে, পরিবেশ অধিদপ্তর ও বিএসটিআইয়ের সাম্প্রতিক অভিযান সত্ত্বেও থেমে নেই এসব ঘিরে রমরমা ব্যবসা। এ বিষয়ে পরিবেশ অধিদপ্তরের একশ্রেণির কর্তা ব্যক্তির বিরুদ্ধে অনৈতিক সুবিধা গ্রহণের অভিযোগও উঠেছে বেশ জোরালোভাবেই।

রংপুর ও রাজশাহী (বগুড়া) পরিবেশ অফিস সূত্রে জানা গেছে, উত্তরাঞ্চলের ১৬ জেলায় প্রায় ১ হাজার ৯০০ ইটভাটা রয়েছে। এর মধ্যে রংপুর বিভাগে প্রায় ১ হাজার ও রাজশাহী বিভাগে প্রায় ৯০০ ইটভাটা রয়েছে। এসব ইটভাটার ৬০ থেকে ৭০ শতাংশই অনুমোদনহীন। সরকারি বিধিবিধান লঙ্ঘন করে এবং কোনো কিছু বিবেচনায় না নিয়ে ইট প্রস্তুত করছে। জনবসতি, ফসলি জমি এমনকি প্রত্নতত্ত্ব নিদর্শনসহ অনেক গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে ইটভাটা করা হচ্ছে। উত্তরাঞ্চলের যত্রতত্র গড়ে ওঠা ইটভাটাগুলো প্রতি বছর প্রায় ১৬ লাখ মেট্রিক টন কয়লা পুড়ে প্রতি মৌসুমে ৫০০-৬০০ কোটি পিস ইট প্রস্তুত করছে। ভাটায় ব্যবহৃত কয়লার কালো ধোঁয়া থেকে নিঃসৃত কার্বন ডাই-অক্সাইড পরিবেশ দূষণের পাশাপাশি মানবদেহে মারাত্মক ক্ষতিকর প্রভাব ফেললেও স্থানীয় প্রশাসন এ ব্যাপারে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারছে না। যেখানে সেখানে ইটভাটা গড়ে ওঠায় প্রতি বছর আবাদি জমি কমছে।

সূত্রমতে, উত্তরাঞ্চলের ১৬ জেলায় ইটভাটা রয়েছে অন্তত ১ হাজার ৯০০। এরমধ্যে পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র রয়েছে ৭০০ থেকে ৮০০টির। বাকি ইটভাটার মালিকরা পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র গ্রহণ না করেই পেশিবলে অবৈধভাবে ইটভাটা পরিচালনা করছেন। জানা গেছে, একটি ইটভাটায় গড়ে ৬ থেকে ১০ একর জমির প্রয়োজন হয়। সে হিসেবে এ অঞ্চলের ইটভাটাগুলো প্রায় ২০ হাজার একর জমি গিলে খেয়েছে। প্রতি মৌসুমে একটি ইটভাটা গড়ে ১৫ থেকে ২০ লাখ পিস ইট প্রস্তুত করতে পারে। সূত্রমতে, একটি ইটভাটা প্রতি মৌসুমে গড়ে ৭০০ থেকে ৮০০ মেট্রিক টন কয়লা জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করে। সে হিসেবে প্রতি মৌসুমে ১৫-১৬ লাখ মেট্রিক টন কয়লা পুড়ছে।

রংপুর পরিবেশ অধিদপ্তর সূত্র বলছে, রংপুরে বৈধ ইটভাটা মোট ইটভাটার ২২ শতাংশ। বাকিগুলো অবৈধ। তাদের বিরুদ্ধে অভিযান চলমান রয়েছে। রাজশাহী বিভাগীয় (বগুড়া) উপপরিচালক বলছেন, এ বিভাগে মোট ইটভাটার ৬০ শতাংই অবৈধ। এগুলোর বিরুদ্ধে অভিযান অব্যাহত রয়েছে। একটি ইটভাটা গড়ে ৭০০ থেকে ৮০০ মেট্রিক টন কয়লা পুড়ছে বলেও জানিয়েছেন তিনি।

দেশের উত্তরাঞ্চলসহ সারাদেশে যত ইটভাটা রয়েছে এসবের অধিকাংশই অবৈধ। সরকারি নির্দেশনা ও বিধি-বিধান না মেনেই এসব ভাটা নির্বিবাদে ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে। ভাটা প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে পরিবেশ অধিদপ্তরের অনুমোদন নেওয়ার বাধ্য-বাধকতা থাকলেও তা কোনভাবেই কেয়ার করা হচ্ছে না। ফলে অবৈধ ইটভাটার মাধ্যমে বায়ূদূষণ, পরিবেশ বিপর্যয়সহ জীববৈচিত্র্যের ওপর মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। জনস্বাস্থ্যের ওপরও পড়ছে বড়ধরনের নেতিবাচক প্রভাব। এমতাবস্থায় অবৈধ ইটভাটার দৌরাত্ম্য রোধে পরিবেশ অধিদপ্তরকে কঠোর অবস্থান গ্রহণ করে দায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। প্রয়োজনে এতদসংক্রান্ত আইনের হালনাগাদ করা দরকার। যাতে আইনের ফাঁকফোকর দিয়ে কেউ পার পেয়ে না যায়। অন্যথায় সারাদেশেই বড়ধরনের পরিবেশ বিপর্যয় দেখা দিতে পারে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ